প্রচ্ছদ / জেলার খবর / বিস্তারিত

For Advertisement

আমরা যারা গ্রামে শিক্ষকতা করি, আমাদের শিক্ষার্থীদের অনেকটা জবরদস্তি করেই পড়াতে হয়।

২৪ জুলাই ২০২৬, ১০:৪১:৫৩

 

আমরা যারা গ্রামে শিক্ষকতা করি, আমাদের শিক্ষার্থীদের অনেকটা জবরদস্তি করেই পড়াতে হয়।

গ্রামীণ শিক্ষকতা শহরের শিক্ষকতার সমান সমীকরণে চলে না। এখানে শিক্ষার্থীদের টেনে-হিঁচড়ে বিদ্যালয়ে আনা, অভিভাবকদের সাথে প্রতিনিয়ত যোগাযোগ রক্ষা করা এবং নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে একটা ‘টিচিং-লার্নিং এনভায়রনমেন্ট’ তৈরি করতে হয়।

​আজ জুলাইয়ের তৃতীয় সপ্তাহ শুরু হলো। বিগত দুই সপ্তাহ ধরে অর্ধবার্ষিক পরীক্ষা চলে। যে সমস্ত দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী স্কুলে আসেনি, পরীক্ষায় অংশ নেয়নি, আজ স্কুল ছেড়ে তাদের চিহ্নিত করে বেরিয়ে পড়লাম খোঁজে। দুপুর পর্যন্ত মোট ৮ জন শিক্ষার্থীর বাড়িতে যেতে পেরেছিলাম। সেই অভিজ্ঞতার এক ঝলক নিচে দেওয়া হলো:

​শিক্ষার্থী ১: সকাল ১০টা ১৫ মিনিট। পিতার কাছে জানতে চাইলে অবলীলায় বলে দিলেন—”ও তো ওপরে ঘুমাচ্ছে!” পাশ থেকে মা বললেন—”ও অসুস্থ।” আমি বললাম, “যে ছেলে প্রতিদিন বিকেলে মাঠে দাপিয়ে ফুটবল খেলে, সে অসুস্থ হয় কেমনে? আপনারা ওকে নিয়ে আগামীকাল স্কুলে আসবেন।”—এটুকু বলে বেরিয়ে পড়লাম। কাজ হয়েছে অবশ্য, পরে সে স্কুলে এসেছে (সব শিক্ষকের জন্য দামি চকলেট হাতে নিয়ে!)।

​শিক্ষার্থী ২: মা বলতে পারেন না ছেলে কোথায় আছে। কেন সে স্কুলে যায় না, তা-ও তিনি জানেন না। অনেক খোঁজাখুঁজি করে তাকে না পেয়ে, পরদিন ছেলেকে নিয়ে স্কুলে উপস্থিত হওয়ার নির্দেশ দিয়ে চলে আসলাম।

​শিক্ষার্থী ৩: সে সকালে প্রাইভেট পড়তে যায়, রোজই যায়; কিন্তু মূল স্কুলে আসে না—এটা তার অভিভাবক জানতেনই না! এবার প্রতিশ্রুতি দিলেন, এখন থেকে নিয়মিত যাবে।

​শিক্ষার্থী ৪: “ছেলে কোথায়?”—মায়ের সোজাসাপ্টা উত্তর, “জানি না, সকালে খেয়ে দেয়ে বেরিয়ে গেছে। আসলে বলব।”

​শিক্ষার্থী ৫: ইদের আগে বেড়াতে গেছে, এখনো ফেরেনি। পিতার বক্তব্য—”শুনছি ক্লাস হয় না, শুধু কোন কোন ক্লাসের পরীক্ষা চলে।” আর কিছু না বলে চলে আসলাম।

​শিক্ষার্থী ৬: ৮-১০ জন সমবয়সী মিলে ব্রিজ থেকে খালে ঝাঁপিয়ে পড়ে ডুবসাঁতার খেলছিল। ডুবন্ত অবস্থায় তাকে পাকড়াও করলাম। তাৎক্ষণিক ড্রেস পরিয়ে স্কুলে পাঠিয়ে দিয়ে পরের গন্তব্যে রওনা হলাম।

​শিক্ষার্থী ৭: একটা দোকানের সামনে তিন ক্লাসের চারজন মিলে মোবাইলে গেম খেলায় মত্ত। পেছন থেকে ধরে ফেললাম সবাইকে। শাসন করে মোবাইলগুলো জব্দ করলাম। পরে অবশ্য ২ জন স্কুলে এসেছিল। মোবাইল ফেরত নিতে কোনো অভিভাবক এখনো আসেননি।

​শিক্ষার্থী ৮: মেয়ে স্কুলে যাচ্ছে না কেন? “ও না-কি আর পড়বে না, যাবে না। নাম কেটে দিয়েন স্যার!”—এক ‘গর্বিত’ মায়ের তৃপ্ত উচ্চারণ!

​এই নিয়েই আমাদের প্রাত্যহিক সংসার। এরপরও যখন আমাদের প্রতিষ্ঠান থেকে ৭-৮ জন ‘এ প্লাস’ পায়, তখন আমাদের ‘মিনি পার্লামেন্টে’ (চায়ের টঙে) সমালোচনার টাইফুন ওঠে। চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে তথাকথিত সুধীজনেরা রায় দেন—”ইশকুলডা শ্যাষ অইয়া গ্যাছে, এহন আর লেহাপড়া অয় না!” তখন সবাই যেন এক একজন মায়াকান্না করা পরম বিচারক!

​এখন সুধীজনদের কাছে আমার প্রশ্ন—আজ জুলাইয়ের মাঝামাঝি, বেতন শেষ। এই নামকাওয়াস্তে বেতন দিয়ে বিশ্বমানের নাগরিক তৈরির গুরুদায়িত্ব আমাদের কাঁধে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। এই পর্বতসম দায় আমি ক্যামনে বহন করব?

​এরপরও অবশ্য কিছু কথা বাকি থেকে যায়…!

​গ্রামীণ_শিক্ষকতা শিক্ষক_জীবন বাস্তবতা অভিভাবক_সচেতনতা
সংগৃহীত -সবুজ হাসান স্যার।

For Advertisement

Cumillar Voice’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

মন্তব্য